শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। সম্পাদকীয় : অনুপম বলছি ।।




সম্পাদকীয়

।। প্রত্যেক প্রজন্মে ভাষার বিশৃঙ্খলার মাত্রাটা বদলে যায়। এ কারণেই সিনিয়র খ্যাতিমান কবিদের কবিতা পড়াতে গিয়ে তরুণ কবিরা প্রায়ই অম্লমধুর বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নিজের অভিজ্ঞতা আর অবস্থান থেকে এ নিয়ে কিছু বলছি। কমবয়সী উচ্চাকাঙ্ক্ষী কবিদের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত সিনিয়র কবিরা দুটো পন্থা নেন। এক, তিনি সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবেন, আপনার অনেক চেষ্টাতেও তিনি একবার চোখ বুলিয়ে নিয়েই আপনার কবিতা আর পড়বেন না, পড়লেও একটা শব্দ উচ্চারণ করবেন না, অপেক্ষা করবেন আপনার ফুরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তেরদুই, তিনি আপনার কবিতা পড়বেন, প্রচুর মতামত দেবেন, অঢেল প্রশংসা করবেন, দু-চারটে লাইন বা শব্দ বদলাতে বলবেন, নিজেদের রাস্তায় এনে আপনার কবিতা ছাপবেন, কবিতা উৎসবে ঢোকার ফাঁক করে দেবেন, এবং এই ফাঁকে আপনার আত্মার একটা নিরপরাধ অংশে নিজেকে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দেবেন, যখন আপনি নিজে কিছুটা উন্নতি করবেন এঁরাই তখন বিমুখ হয়ে আপনার সম্পর্কে কটুক্তিও করবেনআর একদল আছেন, তাঁরা সংখ্যায় অতি অল্প, তাঁরা বয়সের ধারণার উপরে, চিরতরুণ, কবিতার পিপাসার্ত পাঠক, কবিতা লেখার পাশাপাশি প্রচুর কবিতা পড়েন, কিন্তু তাঁরা প্রতিষ্ঠিত নন, আপনাকে কিছু পাইয়ে দিতে পারবেন না, কবিতা ছাড়া কিছু বোঝেননি বলে নিজেরাই প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননিতাঁদের সঙ্গে কথা বলতে পারলে আপনার কবিতার কল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু, আগে আপনাকে বুঝতে হবে, আত্মা-ছিনতাইকারী এবং তৃষ্ণার্ত মানুষের পার্থক্যটা। কোন প্রশংসা আপনার প্রাপ্য, আর কোনটা আপনাকে কিনে নেওয়ার দাম, আগে বুঝতে হবে।।
                                                          অনুপম মুখোপাধ্যায়
                                                          পরিচালক, বাক্


শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। কবিতা : সাজ্জাদ সাঈফ ।।




প্রশ্ন করছে হাওয়া

আর, ধরো, চারদিক থেকে রোদের ত্রিশূল এসে, বিদ্ধ করছে তোমায়; এই পথ দিয়ে গেছে লাশবাহী ভ্যান, তুমি এতো সকালে হাঁটতে বেরিয়েছো; তোমাকে প্রশ্ন করছে হাওয়া, সে হাওয়ায় ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে ভেসে আসে মেঘ, তোমার দিকে একটা বিশাল ট্রাক ছুটে আসছে, বাবার কাশির শব্দে কান খাড়া করে আছে বাস্তুসাপ!
আর, ধরো, চারদিক থেকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির নিউজ এসে
টুল পেতে বসেছে তোমার মগজে, খুলির পাশ দিয়ে যমুনার
ঢেউয়ের আওয়াজ, বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে
আসছে মানুষ; একটা সুপারি গাছের নিচে, কথা বলা পাখিগুলা
জড়ো হয়েছে, তুমি ভাবছো!

মাঠের মাঝখানে ভোটের ক্যাম্প, তুমি ভাবছো, একটা
নির্যাতিত নক্ষত্রের কথা, একটা চাকরিচ্যুত পোষা কুকুরের
কথা, একটা নিখোঁজ সাইকেলের হর্ণ!

বাবা চেয়ে আছে, তুমি ঘরে যাও, দরজা খুলে যাচ্ছে মেঘের আঘাতে!

।। বাক্ ১৩৫ ।। কবিতা : অনুপম মুখোপাধ্যায় ।।






।। পিচ্ছিল যৌবনে দুঃখিত ঘাতক ।।

।। গাভীর মুখে চিবোনো ঘাস হস্তমৈথুনের মতো অবাক্‌ হয়ে গেছেএমনভাবে তাকালে যেন তোমার চোখ তোমার নিজেরই পছন্দের নয়। এ জীবন জলের দরে শুদ্ধএ জীবন মাছবাজারে শুয়ে থাকা বহুদূর বন্দরের ছায়া। বুক চিরলে সাদাকালো টিভির সরল প্যানেল দেখা যাবে। বোঝা যাবে মাটির মধ্যে ধাতু কেমন ঘুমায়আকরিক শব্দটার মধ্যে চিরকালীন মেছুনির বেগানা চুপড়ি খোলা আছেপ্রেমপ্রস্তাবের আছে নিজস্ব গ্রহউপগ্রহ পাখনা আর আঁশপৃথিবীতে অনেকরকম মাছঅনেক স্বাভাবিক স্বপ্ননকল স্বপ্ন দিয়ে মানুষকে মেরে ফেলার ছকভয় আর ডিপ্রেসন হাত মেলাচ্ছে। রাগ আর ডিপ্রেসন হাত মেলাচ্ছে। পুজোর শায়া ছোট বলে কেউ না কি গলায় শাড়ি দিয়েছিল বুড়ো নিমগাছের ডালে। অকারণ আত্মহত্যা বিশাল গাছটাকে আরো একা করে দ্যায়। আমিষের সাশ্রয়ে থাকবে কাঁটাপৃথিবীর সব স্মার্টফোন একসঙ্গে ঢাললে মাউন্ট এভারেস্টের চেয়ে ভয়াবহ লাগবে শান্তিকে পেছনে রেখে সূর্যের যন্ত্রপাতি সামনে যেতে চাইবেমন থেকে নাম না জানা পাতার মতো মরে যাবে তুমি। পাতা খসার আগেই পাতা কুড়ানোর জমি ঢালু হয়ে যায়। মাটি থেকে উঁচিয়ে থাকা ভাঙা গোলপোস্টের মতো ১ লিঙ্গ তোমাকে আরেকবার নিশ্চিহ্ন করবে। কুঠার নয়চাকু নয়। ১ ফোঁটা রক্ত নয়ভেবেছিলাম তোমার মৃত্যু কাল্পনিক হবে। তুমি আমার অস্থিরতায় মরবে। পবিত্র হ্রদের উপর ছটফটে রঙিন প্রোটিনবিজয় পতাকা। যোনির বদলে তুমি সংবিধান খুললে। পাখি পোড়াতে গিয়ে কেন দেবতা হয়ে ফিরব। পিচ্ছিল যৌবনে দুঃখিত ঘাতককে মানায়পুরোহিতের মুখোমুখি আরেক পুরোহিত এমন মৈথুন আমরা কেন করব আর।।


।। গালিব ও পোল্ট্রিযাপনের পালক।।

।। আজ সকালে সেই মোরগটার ডাক শুনলাম গালিব যেটার শুনতেনকাটার ঠিক আগে। আড়াই প্যাঁচ। কিছুটা ধুলো আর পালক ওড়ার পরে নিথর। ঈষৎ রক্তের ছিটে খোলা চোখ লুটিয়ে পড়া ঝুঁটিটার লাল রিক্ততা। ও কি জানল যে ওকে খাবে জীবনে সে ১ দিনও রোজা রাখেনি। ও কি জানে সিপাহী বিদ্রোহে যত রক্ত আছে ঘাস তত নেইআমি মোরগের মাংস ভালবাসিনরমাংস মনে হয় না আমার। ও যে ভোরের পাখি সেই ভোরে আজও আমার জন্ম হয়নি। বিদ্রোহীর মৃত্যু হলে ঝুলন্ত পা দেখে কুঁকড়ে যাই গলাকাটা কিশোরীর মতো। খুনি যদি সামনে দাঁড়ায় এমন মুখোশ আমি পরে নিতে চাই আমাকে যাতে সে আর চিনতে না পারেছুরি থেকে দূরে গিয়ে মোরগ হতে চাইচিরকাল মোরগরা নিজ নিজ ভোর খুঁজে একলা ডেকেছে। ওরা চেষ্টা করে রাত থেকে যত দূরে যাওয়া যায়সমবেত সঙ্গীতে আমিও আর আজকাল আস্থা রাখি না। ১-এর অধিক মুখে ১-ই গান পৃথিবীতে আজ অবধি গাওয়াই হয়নি। চেষ্টা করি চপার থেকে যতটা দূরে যাওয়া যায়। মাংস রাঁধার মরসুমে মানুষের প্রতি মানুষের দোষারোপের ধরণ বদলে যায়। গদ্য আর কবিতাকে মশলার বাণিজ্যে আমি আলাদা করে চিনতে পারিনিবেঁচে থাকা আর বেঁচে যাওয়ার মধ্যে পোল্ট্রিযাপনের পালক পড়ে আছে।।


।। বাক্ ১৩৫ ।। অনুবাদ কবিতা : এডওয়ার্ড এসলিন কামিন্স ।। অনুবাদক : শৌনক সরকার ।।




কবি পরিচিতি - এডওয়ার্ড এসলিন কামিন্স- এর জন্ম ১৮৯৪ সালের ১৪ই অক্টোবর মেসাচুসেটস-এর কেম্ব্রিজে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্রান্স থেকে স্বদেশে যুদ্ধবিরোধী যেসব চিঠিপত্র তিনি লিখতেন, সেইসব সমালোচনামূলক মন্তব্যের জন্য তাঁকে ফ্রান্সের এক শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়। ঐ শিবিরের অভিজ্ঞতাই তাঁকে, দ্যা ইনর্মাস রুম নামের উপন্যাস লিখতে প্রণোদনা যোগায়। উপন্যাসটি ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়। প্যারিসে বসবাস করার সময়ে তাঁর লেখা 'টিউলিপস এন্ড চিমনিজ' নামের একক কবিতার সঙ্কলন প্রকাশিত হয়।





তোমার শরীর ভালো লাগে


আমার এই দেহটাকে ভালো লাগে
যখন সান্নিধ্যে থাকে তোমার শরীর।
 যেন সম্পূর্ণ নতুন কোনো কিছু যেখানে
পেশীগুলো দৃঢ়তর স্নায়ুরা সতেজ
ভালো লাগে তোমার শরীর।
অস্থি মজ্জা মেরুদণ্ড
যাবতীয় অনুভব ভালো লাগে, দৃঢ় মসৃণতা শুধু
তিরতির করে  কেঁপে ওঠে।
আমি বারবার শুধু চুমু খেতে চাই
তোমার যত্রতত্র চুমু খেতে ভালো লাগে
বিভক্ত শরীরে তোমার চমকিত রেশমি গুঁড়োয়
কোমল স্পর্শ ভালো লাগে...
কামনায় ভেঙে পড়ে তোমার নয়ন
আমার শরীরের নীচে সম্পূর্ণ নতুন হবে তুমি
হয়তো লাগবে ভালো সেই শিহরণ প্রতিমুহূর্তে

বৃহস্পতিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। কবিতা : অনুরূপা পালচৌধুরী ।।




ঝুলন্ত ত্রিভুজের স্ট্রীপ লাইট

আর কিছুদিন পর মৃত্যু
মৃত্যুর পাশে বাস্তুমোম : সুস্থায়ী ইকোলজি 
এইযে নিষিক্ত আগুনের ফরমান
ব্লকবাষ্পের ফতুয়াধারী শরীরবীজ

গলছে জোয়ার
অথবা শ্লেষ্মানদীর প্যানিক ঘাসজহরী

ওহ্ ভেটেরিনারি জিভ হাত থেকে হাতদর
কতটা ঘনিষ্ঠতা যাযাবর কুয়াশার চূড়ান্তকারী বিপর্যয়
সমতল থেকে ত্রিকোণ মুখোশের জলীয় পতাকা
শ্যুট আফটার শ্যুট___
প্রতিনিয়ত ব্ল্যাককীটের গভীরতা মাপি




মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫।। অনুবাদ কবিতা : লরেন্স ফার্লিংগেতি ।। অনুবাদক : জয়িতা ভট্টাচার্য ।।



কবি পরিচিতি : লরেন্স মোসান্টো ফার্লিংগেতি একজন আমেরিকান কবি হিসেবে পরিচিত হলেও, একাধারে পেইন্টার, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেও সমান সমাদৃত। ২৪ শে মার্চ,১৯১৯ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন এই কবি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বই 'A coney island of the mind' ১৯৫৮ সালে প্রকাশের সাথেসাথেই সাড়া ফেলে। এই বইয়ের মধ্যে 'I am waiting ' 'Junkman's obbligato' ইত্যাদি কবিতাগুলি উল্লেখ্য। বিট জেনারেশনের কবি হিসেবে বিবেচিত হলেও, পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে একটি ডকুমেন্টারিতে তিনি নিজেকে বিট পোয়েট বলতে অস্বীকার করেন এবং বলেন "Don't call me beat poet. I was never a beat poet."







দুনিয়া একটা সুন্দর জায়গা

দুনিয়া একটা সুন্দর জায়গা
জন্মানোর পক্ষে
সুখ শান্তি নিয়ে যদি বিশেষ 
মাথা না ঘামানো যায় 
যদি একটু আধটু নারকীয় ছোঁয়া 
যখন তখন
অবহেলা করতে পারো
এটা ভেবে,
হ্যাঁ
স্বর্গেও কি আর সব সময় গানবাজনা হয়!

ওঃ পৃথিবীটা সুন্দর জায়গা
জন্মানোর পক্ষে 
যদি তুমি খুব কিছু মাথা না ঘামাও
কিছু লোক যে মরেই যাচ্ছে
সব সময়
অথবা নিদেনপক্ষে উপবাসে আছে
মাঝেমধ্যেই
যেটা তখন অত খারাপ নয়
যদি না হও তুমি স্বয়ং

উচ্চপদে বসে থাকা মড়াগুলোকে নিয়ে
অথবা একটা দুটো বোমা
যখন তখন
তোমাদের উৎক্ষিপ্ত মুখে
অথবা এমনই অন্যান্য গোলমেলে ব্যাপার
কারণ আমাদের নামীদামী সমাজ
গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শিকার
বিলুপ্তপ্রায় ব্যক্তিদের শিকার
এবং পুরোহিতদের
এবং অন্যান্য চৌকিদারদের

এবং বিবিধ নিঃসঙ্গতা
এবং মহাসভার অলীক তদন্ত 
এবং আরো কিছু কোষ্ঠকাঠিন্য 
আমাদের নির্বোধ মাংসে যার
উত্তরাধিকার

হ্যাঁ পৃথিবীটা জায়গা তো ভালোই
অনেককিছুর জন্যই
মজারদৃশ্য
প্রেমের দৃশ্য
দুঃখের দৃশ্য
নিচুগলায় গান আর অনুপ্রেরণা
ঘুরে বেড়াও
দেখে যাও
গন্ধ শোঁকো ফুলের
হাঁস-হাঁস মূর্তিগুলো আছে
এমনকি একটু ভাবতে-টাবতে পারো
মানুষকে চুম্মা দিতে পারো
বাচ্চা বানাতে পারো এবং প্যান্ট পরতেও পারো
টুপি নাড়াতে পারো
এবং নেত্য করতে
নদীতে একটু সাঁতার কেটে এসো
পিকনিকে যাও
মধ্যগ্রীষ্মে
আর স্রেফ সাধারণভাবে
‘প্রাণসঞ্চার করো’
হ্যাঁ
ঠিক এর মধ্যিখানেই
হাসিমুখে এসে পড়েন

সৎকারের কারবারিটি







রবিবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। বিশেষ গদ্য : পৌলমী গুহ ।।




বিজনবালা ও ভুল সুরের গান


ডাকনামের নদীটি তখনো ছলো ছলো হয়নি তেমন। প্রত্যেকের ভেতরেই আসা-যাওয়া করেনা বিবাগী বিকেল। এ গল্প সেই সময়ের।
     আসলে প্রতিটা গল্পেরই শুরু থাকে(অন্তত থাকাটা বাধ্যতামূলক!), নাহলে সাত-পাঁচ নেই হঠাৎ গড়গড়িয়ে গল্প শুরু হলো-এমনটা মানাবে না। এটা আমি ভাবলাম। আপনারা কী ভাবেন তাতে গল্পের কিচ্ছুটি যায় আসে না! অতএব এক নিস্তব্ধ বিকেল (অথবা দুপুর) এবং একটি আলোমাখা ধুলোমাখা রাস্তায় এ গল্পের সূত্রপাত।
   ইস যাহ্! ভুলেই গেছি। ওই দেখুন, গল্পের নায়িকার সঙ্গেই আলাপ হলো না। আরে গল্প মানেই তাতে একটা নায়িকা থাকবেই। থাকতেই হবে। নায়ক? না,আমি ফেমিনিস্ট বাপু। শুধু নায়িকাই চাই। এ গল্পেও আছে, নাহলে গল্পটা তো গল্পই হতো না। সত্যি হয়ে যেতো! সত্যি জিনিসে কারোর মন ভরে না। ছেঁদো কথা রেখে আসুন নায়িকার সঙ্গে আলাপটা সেরে ফেলুন। নায়িকা বিজনবালা। ব্যাস্!
বিজনবালাকে আমি চিনিও না। কোনোদিন চিনতাম হয়তো, এখন ভুলে গেছি। হয়তো যে শহরে দেখা হয়েছিলো, সেখানে ছোটোখাটো একটা নদী তখনো বহতা। হয়তো বা ঝিরিঝিরি পাতা তখনো রাস্তায় হাঁটি হাঁটি পা পা করতো। শীতশেষের বিকেল দীর্ঘশ্বাসে তাদের বিরক্তই করতো নির্ঘাত! বিজনবালা সেই শহরেরই কোনো রোদপড়া ঝুম গলিতে দাঁড়াতো। নিয়ম মতো বিজনবালার রূপ বর্ণনার কথা এখানে, কিন্তু যাকে দেখিইনি তার বর্ণনা দেবো কি করে? ধরে নিন। যাকে আপনি বিজনবালা মানতে চান, তাকেই ধরে নিন। ব্যস্ত রাস্তায় গোলাপি সালোয়ার অথবা অফিসফেরতা নীল শাড়ি। বিয়েবাড়ির এক ঝলক বা মুখবইয়ের গজদাঁত। বিজনবালা তাদের একজন হলেও হতে পারে।
      কিন্তু বিজনবালা এদের কেউ হতে চায়নি। এমনকি এই গল্পটাতেও সে থাকতে চায়নি। বা বলা ভালো, সে এই গল্পটা হোক-তাই চাইতো না। সে চোখ বুজলে একটা সবুজ ভেজা মাঠ দেখতে পায়, তাতে আলগোছে বেগুনি ফুল ফুটে থাকে। ওই মাঠের ওপাশে কি আছে, সে তা জানতেই চায়নি। কারণ সব জেনে ফেললে, জানার ভেতরে খন্ড খন্ড খুশির ছোঁয়া থাকবে না। বিজনবালা অখুশি জীবন মোট্টে চায়না।
    আমরা চাইলেই এবার এখানে একজন নায়ককে আনতে পারি। যদিও আমি নায়ক পছন্দ করিনা, কিন্তু এটা তো আর আমার গল্প নয়। বিজনবালার একজন নায়ক থাকলেও থাকতে পারে। ওফ হো! বুঝতে পারছেন না? এটা তো ঘটেই গেছে। আমি বা আপনি চাইলেই তো গল্পটা বদলে যাচ্ছে না। অতএব একজন নায়ক নিঃসাড়ে ঢুকেও গেছে। যদিও এতোদিন পরে তার চশমার ফ্রেম, চোখের বন্দিশ, পাঞ্জাবির হলুদ ধাঁধা কিছুই মনে পড়ে না ঠিক ঠিক। তবু বলতেই হবে তার হাসির তারল্য বিভ্রম জাগাতো বটে।
   তো নায়ক এলেই তো হলো না, তারও একটা গল্প আছে। কিন্তু সে গল্পটা এতোটাই ধোঁয়াটে যে ভেল্কির চাইতেও অবাক লাগবে। তাই আপাতত এটুকুই জানা রইলো এই তরল হাসির নায়ক ও গরল চোখের নায়িকার মিল-টিল হবে না! এমনকি ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে চোখে-চোখেও নয়। মনে তো নয়ই। মন ব্যাপারটাই বাহ্যিক। যুক্তিবাদীরা অনায়াসে পাশ কাটিয়ে যেতে পারেন। শুধু ঢুলুঢুলু চোখের স্বপ্ন দেখা গবেটরাই এ বালাই টেনে বেড়ান। তেমন কেউ কি পাঠক-সমাবেশে আছেন? তবে দুক্কু পাবেন না যেন! এটাই ফ্যাক্ট। অন্তত এ গল্পের নায়িকা সেটা মানে।
   আমার আর এই গল্পে কোনো ভূমিকা নেই। আপনারও নেই বোধহয়। এতক্ষণ ধরে এই সময়টুকু আপনি স্রেফ নষ্ট করলেন। ভালো বাংলায় জলাঞ্জলি দিলেন। আপনি ধরেও নিলেন, আমি একটি বড়োসড়ো হারামি। আমি এরকম ভাবেই আপনাকে ঠকাচ্ছি। সত্যি বলতে কি, আমি তাই। তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। কারণ বিজনবালার নায়ক এবং বিজনবালা উভয়েই জানে, সব গল্পের শেষ হতে নেই। শেষ থেকেই শুরু হতে পারে। আর সেই ছোট্টো ছিদ্র দিয়েই বড়োসড়ো শেষের আশঙ্কা ঢুকে পড়তে চায়। সেখান থেকে শুরু হবে দৌড়! স্বখাত সলিলে ডুবে যাওয়ার আগে সেই দৌড়খানা দৌড়তেই হবে। পেছনে পড়ে থাকবে রোদঢালা গলি আর ঝিরিঝিরি পাতাদের লাশ। নিমফুলি বিকেল আর মনখারাপিয়া হাওয়ার যুগলবন্দি। ভোর হওয়ার আগের শান্ত আকাশ থেকে নেমে আসা রাতভোরের স্বপ্ন।
ডাকনামের নদীটি ছলোছলো হলো বলে...

।। বাক্ ১৩৫ ।। বিশেষ গদ্য : মণিদীপা সেন ।।




৯০° এর মাঝে যতটুকু শূন্যতা

যাদের জীবনে অনেক গেছে, অত্যন্ত তেষ্টাতেও তারা বোতলের নিচে খানিকটা জল বাঁচিয়ে খায়- তা সংকোচ না সঞ্চয় ধরা মুশকিল। গেছে আমারও, সবচেয়ে বেশি- যা গেছে- অনুভূতি, দুটো পায়ের সমতলে মাটি ছোঁয়ার অনুভূতি। ক্রমশ সঙ্গীহীন হয়ে এসেছে আমার ডান পা ততোধিক আলাদা হয়ে গেছি, নিজের মধ্যে একা হয়ে এসেছি। কিন্তু আক্ষরিক অর্থে নিঃসঙ্গ আমি কোনোদিনই নই।
কিছু “যাওয়া” তৃতীয় নয়ন আর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় উপহার দেয়। কানের পাশের সাঁ সাঁ হাওয়া কাটার শব্দটা যেদিন থেকে মিলিয়ে এসেছিল, কাঁদিনি। কাঁদার বোধ আসেনি তখনও। ছোটোবেলায় মানুষ শুধু ব্যথায় বা খিদেয় কাঁদে – হারানোর সুদূরপ্রসারী কষ্ট তখন তাকে ভাবাতে পারে না।  দিনে দিনে উডল্যান্ডস ক্যান্টিনের চকোলেট পেস্ট্রির মাথার চেরিটার সাথে বন্ধুত্ব বাড়ছিল আর আমি কিতকিত খেলায় তুখোড় হয়ে উঠছিলাম। “ঠিক হয়ে যাবে”- বিশ্বাস করতাম। তারপর বছরের পর বছর প্রতিটা মাইনাসকে আড়ে লম্বায় সাজাতে সাজাতে বুঝে গেলাম কিছুই ঠিক হয়না মনের মত করে, ঠিক’-এর সংজ্ঞাটা বদলে নিতে হয়- শুধু।
ফি রোববার মুরগীকে মুরগী করার মতই আমিও হয়েছি, বুঝেছি পরে। বেহালার বালানন্দ- দু’মাস টানা ট্রাকশনের পরে এক সকালে মা বেড থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুব করে কচি কলাপাতা রঙের একটা সাবান মাখিয়েছিল। লেবুগন্ধে মুরগি হতে হতে বুঝিনি সেদিনই আমার কাটবে! পাছায় থাপ্পর মেরে একজন নার্স হাসতে হাসতে গুঁজে দিয়েছিল- আর একজন চামড়ার নীচে কী একটা- জন্মের জ্বালা করেছিল একটা সদ্য জন্মানো ফুটকিতে। নীল সার্কেল হাতে বসে থাকতে থাকতে বেলা বাড়ল- জানতে পেরেছিলাম সু-সাইড ক্যান্সেল-এর মত অপারেশন ক্যান্সেল। ডাক্তার আসতে পারেনি। বাচ্ছা বয়েস- খুব আনন্দ হয়েছিল। মুরগি হয়েছি আরেকবার, বুঝিনি। সাতদিন পর সকাল থেকে সেম প্রসেস পুনরায় অ্যাপ্লাই করে প্রথম নেশা করেছিলাম ক্লোরোফর্মে। জানেন হয়ত, বুজটা ভীষণ লংলাস্টিংএই আড়াই মাসে আমি স্যালাইনের বোতল কেটে একটা দুর্দান্ত ডিজাইনের ফুলদানি বানানো শিখেছিলাম। সেখানে জল ঢেলে আজও বসে। কিন্তু এরপর কেউ আর ফুল দেয়নি।
ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ- জুনিয়র ডাক্তাররা শিরা খুঁজছে। পূর্ব অভিজ্ঞতায় আঁটি আমি কনুইয়ের খাঁজ দেখিয়ে বলেছিলাম, “এখানে পাবেন”। সেসবে কান না দিয়ে দুটো হাত মিলিয়ে সাকুল্যে বারো বার সূচ ফুটানোর পর ওরা আমার বলা জায়গায় আসে এবং পায়! এরপর দীর্ঘদিন সেই চ্যানেল দিয়ে বুড়িগঙ্গার জলের মত তিরতির করে বয়ে গেছে বিভিন্ন অ্যাম্পুল ব্লেড দিয়ে শিরা চেরা জ্বালা নিয়ে হসপিটালের ছাদে মায়ের কোলে ঘুরেছি। দেখেছি ছাদের জায়গায় জায়গায় পিচচটের তালি –ঠিক আমার পায়ের মতো
ভেলোরে সাত ঘন্টায় আটাশটা সেলাই, পায়ের গোছে হাড় ড্রিল করে উন্মুখ শিক থেকে ছোট ছোট বালির বস্তা ঝুলিয়ে রাতকে রাত ট্রাকশন দিত আর আমি চাদর খামচে ঘুমের ওষুধ চাইতাম। দিত না সবসময়। তখন একটু বড়- খিস্তি শিখেছি! এরপরেরটা আপনারা বুঝে গেলেও যাদের দিতাম তারা বোঝেনি কারণ ওই ডাইভারসিটি, যাতে ইউনিটি রক্ষিত হয়। ওই কদিনে আমি একজনকে ভালবেসেছিলাম। আমার যন্ত্রণায় ঝাপসা রাতগুলোয় ওর শিফট থাকলে আমার মাথার কাছে বসে বাইবেল পড়ে শোনাতেন। আর আমার ঠোঁটের চামড়া ফেটে গুটিয়ে গেলে তুলোয় করে একটা ভিজে ভিজে কী এনে যত্ন করে লাগিয়ে দিতেন ঠোঁটে। উনি আনম্যারেড ছিলেন। একটি সন্তান দত্তক নেন। আমায় কয়েকবার জড়িয়ে ধরেছিলেন। ওর অ্যাপ্রনে একটা ঘুম গন্ধ ছিল।
সাকসেস এরপর এসেও চলে গেছে। আরব কটেজের ব্যালকনিতে শেষবার ওরা একসাথে মাটি ছোঁয়। বিশ্বাস হচ্ছিল না, ঠাণ্ডা মেঝেতেও এত সুখ! বুকের শ্বাস চোখ দিয়ে ঠিকরে গেছিল, কেউ জানে না ব্যালকনির রেলিং চেপে ধরেছিলাম খুব  নাচ শিখতে ইচ্ছা করেছিল।
আসলে কী জানেন? যাদের এসেও থাকেনি, যারা পেয়েও হারিয়েছে তাদের মত জলতেষ্টা আর কারও পায়না। তারা শেষপর্যন্ত শেষ করেও খানিকটা বাঁচিয়ে খায়। তা উদারতা না শূন্যের প্রতি  ভয়, বলা মুশকিল।



বুধবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। ধারাবাহিক স্মৃতিকথা : আমার বাবা ।। বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় ।।





পর্ব : ১১


কবি কালীপদ কোঙার বাবাকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে বলেছিলেন-“মোহিনীমোহনের যেন তিনখানি পা, একটি স্বর্গ, একটি মর্ত এবং অন্যটি পাতাল ছুঁয়ে আছেমজা করে বললেও কথাগুলির সারমর্ম এই যে একই মানুষ নিরলসভাবে দুর্বল শরীর নিয়েও কীভাবে এত দৌড়ঝাঁপ করতে পারেন সদাচঞ্চল দৌড়ে বেড়ানো একজন মানুষকে তুলে ধরতে গিয়ে খুব প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি উত্থাপন করেছিলেন কথাগুলি।     
 আসলে বাবার নিত্যদিনের দৌড়ঝাঁপ, কবিতার জন্য আজ কাকদ্বীপ কাল কোচবিহারএই যে পরিভ্রমণ তাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি বলেছিলেন এই কথাগুলোপ্রতিনিয়ত চঞ্চল যে মানুষ তিনি লেখেন কখন?চব্বিশ ঘন্টারই তো দিনরাত শুধু কবিতার ডাকে নয়সম্পাদনার জন্যও বাবাকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে দিনের পর দিন   কেতকীর সম্পাদকীয় দপ্তর শিয়ালডাঙ্গায়, পত্রিকা ছাপা হয় বিষ্ণুপুরে (পুরুলিয়া সুনীতি প্রেস থেকে কেতকী মুদ্রণের বিষয়টি তখন বিষ্ণুপুর নিউ বীণাপাণি প্রেসে স্থানান্তরিত হয়েছে, এই বিষয়ে পরে বিশদে বলা হবে) বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে সিরজাম স্টেশন।সে রাস্তা তখন ছিল উঁচু নীচু অসমতল।সাইকেল চালানো যেত না।পাঁচ কিলোমিটার এই দুর্গম রাস্তা বাবা পচিশ মিনিটে হেঁটে দিতেন অনায়াসে। সারাদিনে ট্রেন চলত দুজোড়া।প্রতি রবিবার অথবা ছুটির দিনে সকালের ট্রেন ধরে বিষ্ণুপুর গেলে ফিরতে ফিরতে মাঝরাত। বিষ্ণুপুর স্টেশন থেকে বৈলাপাড়ায় নিউ বীণাপাণি প্রেস।অনেকটাই দূর হেঁটে যাওয়ার পক্ষে। বাবা রিক্সা করতেন না কখনও বলতেন- রিক্সা চেপে পয়সা নষ্ট করার চেয়ে সেই পয়সা পত্রিকার জন্য ব্যয় করলে আরও সুন্দর হবে কাগজটি। সাত সকালে কোনরকমে  চাট্টি ভাত খেয়ে বেরিয়ে সারাদিন চা আর বিড়ি খেয়েই কাটিয়ে দিতেন।কখনও মন গেলে চপ বা মিষ্টি।সেও খুব কমদিনই।কৃপণতা নয় নিজের ব্যাপারে বাবার ভাবনা ছিল এরকমই।পত্রিকা যদি আরও একটু ছিমছাম আরও সুন্দর করা যায়। ফলে শরীরও বিদ্রোহ করত বিভিন্ন সময়ে।
শুধু কেতকী নয় একই সাথে বাবা তখন যতীন্দ্রনাথ জানা সম্পাদিত কাঁথির নীহার পত্রিকার শিশুদের বিভাগ সম্পাদনা করেন পাশাপাশি  শুভাশিস ত্রিপাঠীর মুগবেড়িয়া পত্রিকার সবুজের আসর দেখাশোনার দায়িত্বও এই দুটি পত্রিকার ছোটদের বিভাগ তখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল এখনও মাঝেমাঝে  স্বর্গীয়  শুভাশিস ত্রিপাঠীর ছেলে স্নেহাশিস ত্রিপাঠীর সাথে ফোনে কথা হলে তিনি  পুরানো সেই দিনের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন- ‘’ আপনার বাবা মুগবেড়িয়ায় কতবার এসেছেন, আমাদের সাথে  একটা পারিবারিক সম্পর্কই তৈরি হয়েছিল তখন মনেই হত না বাইরের কেউআমাদের বাড়িই যেন তাঁর বাড়ি। মুগবেড়িয়া যেন তাঁর দ্বিতীয় জন্মস্থানযতীন্দ্রনাথ জানা এবং নীহার পত্রিকার  সাথেও বাবার ঠিক এরকমই সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলকাঁথির কথাও বাবা খুব বলতেন আমাদের ছোটবেলায়।সেসব গল্প আজ আর বিশেষ মনে নেইঅবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার অসংখ্য তরুণ কবি যারা তখন সাতের দশকে লিখতে শুরু করেছিলেন নীহার পত্রিকার ছোটদের বিভাগের পাতাগুলি পড়তে পড়তে মাঝেমাঝে সেই গল্পগুলির আস্বাদন পাই। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার সাথে তাই বাবার প্রাণের সম্পর্ক, অন্তরের সম্পর্ক কবি শ্যামলকান্তি দাশ, কবি প্রভাত মিশ্র,  সমীরণ মজুমদার , সূর্য নন্দী, কবি বিষ্ণু সামন্ত ,শিখা মাইতি ( তখনও শিখা সামন্ত হননি ) থেকে আরম্ভ করে  মেদিনীপুরের অজস্র  কবির সাথে  বাবার হৃদ্যতার সেই বলয়টি সাতের দশকেই বিকশিত হয়েছিল কবি ও শিল্পী বিষ্ণু সামন্ত সেদিন  ফোনে বলছিলেন-  তখন স্কুলে পড়ি, কতই আর বয়স হবে, সদ্য লেখালেখি শুরু করেছি। নীহার পত্রিকায় ছোটদের বিভাগে লেখা পাঠাতাম, রামনগর থেকে পোষ্ট অফিস ছিল দূরে ।কাদা রাস্তা, কোন যানবাহন চলত না। সেই কাদা রাস্তায় হাফ প্যান্ট পরে  দুমাইল পথ হেঁটে পোস্ট অফিস যেতাম কবে মোহিনীদার চিঠি আসবে। আসতও। যেদিন আসত সেদিন কী আনন্দ হত বলে বোঝাতে পারব না। মনে হত কর্দমাক্ত রাস্তা যেন আর দুর্গম নেই। চিঠিগুলো জমিয়ে রাখতে রাখতে একদিন ভর্তি হয়ে গেল ঘর। আজ হয়ত সব চিঠি যত্নে রাখা নেই। জায়গা বদলের সাথে সাথে অনেককিছু হারিয়ে গেছে।তবু যা আছে তা নিয়ে যখন ভাবতে বসি তখন মনে হয়, আমার মতো অনেককেই তো চিঠি লিখতেন তিনি। সারাদিনে কত চিঠি লিখতেন তাহলে।“ কবি এবং প্রাবন্ধিক প্রভাত মিশ্রও বলেছেন নীহার পত্রিকার ছোটদের পাতা ঘিরে বাবার সাথে গড়ে ওঠা সম্প্রীতির বলয়ের কথা।কবিজীবনের শুরু থেকেই চিঠিপত্রের আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে  কীভাবে আন্তরিক হয়ে উঠেছিল সেই দিনগুলি।  দেখা সাক্ষাতের চেয়েও  চিঠি, শুধু চিঠির ভেতরেই রয়ে গেছে বিভিন্ন সময়ের চিহ্ন।
 
শুধু তিনখানি পা নয়। চারখানি হাতও । এত লেখা প্রতিদিন লিখে চলা।বই তো মাত্র পঁচিশ।অজস্র কবিতা অগ্রন্থিত রয়ে গেছে  দুপার বাংলার সংখ্যাতীত লিটল ম্যাগাজিনের পাতায়। কেউ চিঠি লিখলেই তার প্রত্যুত্তর দেওয়া। কেউ পত্রিকা পাঠালে চিঠি লিখে মতামত লিখে তাঁকে জানানো।কেউ বই পাঠালে তাঁকে প্রতিক্রিয়া জানাতেই হবে।নতুন পত্রিকা যা হয়তো জন্মলাভ করেনি তখনও।প্রথম সংখ্যা বার করার তোড়জোড় চলছে । পোস্টকার্ডে একটা ছোট চিঠি এসেছে লেখা চেয়ে।হতাশ হতেন না সেই সম্পাদকও । ছোটকাগজের সাথে যুক্ত কাওকে ফিরিয়ে দেওয়া বা প্রত্যাখান করা ছিল বাবার চরিত্রের বিরোধী। এই বিষয়ে অনেকেই অনুযোগ করতেন- আপনি যেখানে সেখানে লেখেন কেন ? যে যখন চায় দিয়ে দেন।ঘোরাতে পারেন না দশবার ?এতে ওরা আপনার লেখার গুরুত্ব বুঝতে পারবে না, মূল্য বুঝতে পারবে।
কী লিখব এই প্রশ্নটি যেমন বাবার কাছে জরুরি ছিল। তার চেয়েও জরুরি ছিল কোথায় লিখব। যে জায়গাগুলো প্রতিক্রিয়ার ঘাঁটি।যারা স্থিতসাম্যের পক্ষে এবং মানবতাবিরোধী।যারা প্রকাশ্যেই শিল্পীস্বাধীনতা নামক মূল্যবান শর্তটিকে খুন করে।এবং যেখানে লেখকের নিজস্ব স্বর মালিকের অঙ্গুলিনির্দেশে চিরকালের মতো শৃঙ্খলিত হয়ে যায়।এবং এই আনুগত্যের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান মুমূর্ষু লেখকদের ব্যক্তিগত আরাম ও স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করেতাঁদের আনন্দ প্রদানের বন্দোবস্ত জারি রাখে এবং প্রভুভক্তির স্মারক হিসেবে কবিদের অতৃপ্ত বাসনাগুলির দায়ভার নেয় বাবা তো লেখেননি এসব কাগজে শুধু চরিত্রবান ঋজু কাগজগুলির পাশেই থাকতে চেয়েছেন চিরকাল একটি রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাস করলেও যখনই বিচ্যুতি দেখেছেন তখনই প্রতিবাদ করেছেন। আপস করেননি। বলেছেন- একজন সত্যিকারের কবির গলায় কোন বকলস থাকবে না। ক্ষমতা যেন কবির অন্তরে চিরজাগরুক প্রতিবাদের স্বর কেড়ে নিতে না পারে। কোন অবস্থাতেই যেন ঠোঁট ও কলম বেঁকে না যায়।ফলে কবিতার মতো কণ্ঠস্বরকেও হতে হবে বজ্রনির্ঘোষ।
এখন রাজ্য জুড়ে প্রচুর সিভিক কবি।তাঁরা লেজ নাড়ছেন আনন্দে।রাজসভা ধন্য করার গৌরবে ফেটে পড়ছেন। এইসব  সিভিক কবিরা  অন্তরের আকুতি থেকে নয়,যন্ত্রণা থেকে নয়,হৃদয়ের শুদ্ধতম চেতনার বহিঃপ্রকাশ থেকে নয়  ক্ষমতার অনুপ্রেরণায় অনুপ্রানিত হয়ে তাঁরা কবিতা লিখছেন কবিতা পড়ছেন। নির্ভীক করছেন্র বিপরীতে সিভিক কবিতার এই যে  উন্মাদনা তা দেখে  শিহরিত হতে হয় আমাদের।প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক আধিপত্যবাদের পায়ের তলায় লুটিয়ে গেছে শিরদাঁড়া।কোন উচ্চারণ নেই, অথচ উচ্চারণের নিরন্তর নির্মাণই তো একজন কবির ভবিতব্য।     

হাত, পা এবং গলার স্বর এই তিনটে জিনিষই বাবার আইডেন্টিটি।ফিসফিস করে বাবাকে কখনও কথা বলতে শুনিনি। যা বলতেন জোরেই। এক মাইল দূরের লোক যা শুনতে পাবে স্বচ্ছন্দ্যে।কারোও নিন্দা পছন্দ করতেন না। যা বলার সামনেই মুখের উপর বলে দিতেন। পরে আফসোস করতেন, বলাটা বোধহয় ঠিক হল না।  সেরিব্রাল স্ট্রোক বাবার এই তিনটে জায়গাতেই আঘাত করল। লেখা বন্ধ হল। দ্রুতগতিতে হেঁটে যাওয়া পা কেমন ধীর ও নিঃসাড় হয়ে গেল। গলা অস্পষ্ট জড়ানো। তবু আজও শিরদাঁড়া ঝুঁকে যায়নি।
                                                            ( চলবে)

মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

।। বাক্ ১৩৫ ।। গুচ্ছ কবিতা : শানু চৌধুরী ।।




আত্মহত্যা

১.

অলৌকিক তারাদগ্ধ রাত থেকে ছুটে যাচ্ছে আত্মহত্যা। এই প্রবল আত্মার নড়াচড়ায়, স্তন খুঁটে ফেলে যারা হয়েছিল দৃশ্যের শ্মশানবন্ধু। তারা। কোনো নৈশবিদ্যালয়ে ফেলে এসেছে অন্তিম জ্বলন্ত কাঠ। কোনো পাপ নেই। শুধু প্রশংসার ভিতরে অন্ধ পেঁচার মহিমাহীন খেলাধুলো মাঘের পশম নিয়ে উড়ে যায়। এক মুখ বারবার কাঁপে। আর অমূলক জমাট বাঁধা রক্ত, ক্রমশ ক্ষীণ আতঙ্ক নিয়ে ঢুকে যায় আমাদের চেতনারত হ্রদের অন্বয়ে।


২.

মর্গের আলোয় ঢুকে যাচ্ছে তোমার প্রণয়। ব্রক্ষ্মতালুর নীচে যে সন্দেহ প্রবণতা, তাকে রূপ দাও। যেভাবে আক্রান্ত শিলা আদরে বসায় নির্ভীক পুংকেশর। তোমার রোপন শূদ্র হলে এক ব্রাক্ষ্মণ জড়িয়ে ধরবে বিমর্জিত রূপোলি চিরুনি- যার থেঁতলান দাঁতে শিখে ফেলা যায় ভাঙা সিঁদূরের সন্তাপের কথা।


.

স্বচ্ছতা তোমার লালিত্য থেকে কুড়িয়ে এনেছি নরম মুখাগ্নির  ইঙ্গিত অথচ সোয়েটার ছিঁড়ে যাওয়া কুমারী ব্যথার কথা এই পথ আর পাতার পৃথুলতায় পেয়েছে দেবতার ঠাঁই এখন চিমনি পুড়ে যায়। আর ভবিষ্যতের ডিমে দেখি ফেটে গেছে... পালিয়ে যাওয়া ও শনাক্তকরণের ক্ষমা।


.

নিকট ভাষার দিকে নদী ও সন্ধ্যানামা ওষুধের দোকান এই সকল বিউগল নত হলে যতটুকু ভালবাসা, তার ছবি থেকে সরে গেছে মহাসৈকত মায়াধূপ, জ্বেলে আসি ছিটানো জোৎস্নায়এত মানতের রাস্তায়। যেভাবে কারও মুখের নিষ্ক্রিয় কুয়াশা, লিখে গেছে পরিচ্ছন্নতা


৫.

নাভিকাটা ঊষা। কঞ্চির মতো ফুটে ওঠা সকালে ভরিয়ে তুলেছিল গূঢ় মুখাভিনয়। যে বাগান শিখেছে। তার ফুলের কাছে ফেটে যাওয়া ধ্বনি, পরাগ হয়না কখনো। এ ঈর্ষামিশ্রিত সর্বনাশ। তোমার কাছে এনেছি নালিকুলের পয়মন্ত ঢেউ। যেখানে হাতের মাপে পড়ে আছে গোল গোল চুড়ি আর  কাদা লেগে যাওয়া ঘোমটায় ইটভাটার ছাঁচ।


.

সন্ধের ঘোড়ায়, নালের প্রচন্ড শব্দ হয় যেখানে স্থির কোনো তরঙ্গ ফিরে আসে সরোদের আয়ুরেখা ধরে ছাগলের সারি তার নিকটে জ্বেলে রাখে আয়ুবহনের শিখাআর কামারশালা থেকে দূরে কালো হাপরের কোনও জন্ম অফুরন্ত গুনে  চলে শাশ্বত তামসিকতা 


.

পুষ্যানক্ষত্রের দিকে আমি ঘুমিয়ে আছি তুমি বলে দিতে পারো মীনরাশির কোষ্ঠীবিচার ঘুঘুদের ফেনা, গাঢ় হয়ে এলে; কয়েকটি দীপকের পর্যটন তুমি তো জানো যেখানে রাজমুকুট নেই সেখানে নরম হয় ভাত তবুও তোমার খাঁচায় কেন ঢিল মেরে জাগিয়ে রাখতে চাইছি খসে পড়া পালকের হাড়গোড়তুমি তো জানো।


.

 মুখ থেকে উড়ে গেল কুপির আশ্বাস একটা হাড় নিয়ে খেলতে খেলতে পোতাশ্রয় ভেঙে গিয়ে জাহাজ দেখেছিল টেরাকোটার বাগিচা সেখানেই দরজা খুলতে খুলতে আর খুলতে সঙ্কুল হয়ে পড়েছিলাম আর কোনো নির্বাক দুঃখের লাইন সেই নৃশংসতাকে চেপে তৈরি করেছে মাটির পুতুল যার রক্তগন্ধে ব্যাটারি কারখানার শ্রমিক লেগে থাকে


.

কতদূর সে এভাবে যাবে করবীফুলের ধরনে একা লন্ঠন হাতে সন্ধের মাজারে এখন রেমপার্ট ভেঙে যায়, যেখানে চিবুক তুলে দাঁড়ানো বাৎসল্য খালি পায়ে চষে বেড়ায়! তোমাকে শেখাব অ- এর কান্না, এমন নির্ভর হয়োনা দেখবে তোমার ভরসা থেকে খিদের পিত্ত চুঁইয়ে পড়ছে রোজ


১০.

জানলার ঘাস ভেঙে যাওয়ার আগে ছাত্রীর খাতায় লালরঙ এসে বসে এই থেকে যেটুকু অঙ্ক কষতে পারি তার ভিতর একটা চিৎকারের হরিণ এঁকে দিই ক্লান্তিকর প্লীহা! ছুটে যাচ্ছে মাছিদের সঙ্গে উড়তে উড়তেআমার সরসতা, আগুনের পাশে বসে তখন আলোর স্বভাবে জ্বালছে লাঙলের উদয়


১১.

এই শরবন,পবিত্র এখনও দীর্ঘশ্বাসে অয়ন বয়ে নিয়ে যাচ্ছে যে সুখপ্রদ কাফেলা তার সন্ধ্যা-উপসনার পায়রাকে ছিনিয়ে নিয়ে তুমি বলেছ অবসাদ মাংসের মেঘ যে গন্ডুষ ধরে আছে, তাকে বলে দাও ঘনরামের ভণিতার কথা


১২.

ছায়া তোমার আমাকে ভরিয়ে রাখছে এই মুহুর্তের শেষ কবিতা নষ্ট করার স্বপ্ন থেকে, কাঁটা খুলে যায়। ভয়পাখি জেগে ওঠে জলের যোগানে সান্দ্র ঝরণা যখন করুণা হয় নাতা কেবলই মৃন্ময়! মৃত্যুর গায়ে এঁকে রাখে দূর হেঁটে চলা মৃত্যুমুখের ফোটা টিউলিপ।


১৩.

এখনও প্রহর শূণ্য হলে, জেগে থাকে আমলকী বন তোমার নির্মল চলাচলের ধাত গম্বুজের খিলানে যে মসজিদ সেখানে দাঁড়িয়েছি, অবিবেচনার হাসি নিয়ে কোড়াপাখি অবলা তিতির রাতের নিচে ফুঁসছে যে মোষের মর্মান্তিক পেট তার অলংকারে জেনো, রাখা আছে আমাদের পূর্বাভাসের অবলুপ্ত কাক


১৪.

হে জগন্নাথ! তোমার হাতের দূরত্বে রথের ছায়ামরু। অথচ দেরাজের শূণ্যতা টলটল করে তুকতাকের সরায় এখন আকাশ চলে যায় দুর্বল কপিলাবস্তুর জানালায় সেখানে বোনের মতো সাবেকি প্রতিমা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেউ



১৫.

ফলের আকারে ভেঙে যায় মহুয়া
তবু এই করোজ্বল গ্রাস টলটল করে
ভিক্ষুকের আভায়!
যে হাত দুখানি তার নোয়ায় বাঁধানো ছিল
সংসারের ভিড়ে উড়ে গেছে তার অজস্র শুশ্রুষা!
একবার। নিশ্চুপ হওয়ার আগে।
খাঁ খাঁ করে যে মনোরোগের দুপুর
তার অন্নকূটে সুসময়ের বিবাহ
টাঙিয়ে রাখে সারনাথের আকারে সজল আতর